বিনিয়োগে পতন ও দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা

নতুন করে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে চীনের অর্থনীতিতে

চীনে গত মাসে বিনিয়োগ হ্রাসের পরিমাণ ছিল মহামারীর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

চীনে গত মাসে বিনিয়োগ হ্রাসের পরিমাণ ছিল মহামারীর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আবাসন সম্পদের মূল্যহ্রাস হয়েছে অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি। আবার স্থানীয় পর্যায়ে ভোক্তা চাহিদায়ও দেখা যাচ্ছে দুর্বলতা। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধির শ্লথতা মোকাবেলায় দেশটির অর্থনীতির নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপের মাত্রাও এখন বেড়েছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এফটির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দেশটিতে স্থির সম্পদে (ফিক্সড অ্যাসেট) বিনিয়োগের পরিমাণ চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। ফিক্সড অ্যাসেটে বিনিয়োগ স্থিতির পতনের দিক থেকে এটি ২০২০ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। চীনে ফিক্সড অ্যাসেটে বিনিয়োগ পতনের এ হার বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদরা এ সময় দেশটিতে স্থির সম্পদে বিনিয়োগের স্থিতি দশমিক ৮ শতাংশ কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে চীন। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট খাতের পতন দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতির অগ্রগতিকে মারাত্মক চাপে ফেলে দেয়। তা সত্ত্বেও রফতানির ওপর নির্ভর করে স্থিতিশীল ছিল প্রবৃদ্ধি। কিন্তু অর্থনৈতিক সূচকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া এখন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রিয়েল এস্টেট খাতে দীর্ঘায়িত সংকট, অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা ও বহিঃউপাদানগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেশটির অর্থনীতিতে নতুন করে স্থবিরতার আশঙ্কা তৈরি করছে।

চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (এনবিএস) তথ্য অনুযায়ী দেশটিতে অক্টোবরে নতুন বাড়ির দাম আগের মাসের তুলনায় কমেছে দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা বিগত এক বছরে সবচেয়ে বেশি মূল্যহ্রাস। এর আগে সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল দশমিক ৪ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবৃদ্ধিকে টিকিয়ে রাখতে চীন সরকার নানামুখী প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগ, ভোক্তা ব্যয় ও ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো এখনো কাঙ্ক্ষিত গতিতে ফিরতে পারেনি। এসব সূচকের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতিতে শ্লথতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিটির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও প্রকট হয়ে উঠছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

আইএনজি ব্যাংকের গ্রেটার চায়না অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং বলেন, ‘সব দিক থেকেই চীনের মূল অর্থনৈতিক সূচকগুলো শ্লথ হয়েছে। এ অবস্থায় চলতি বছর ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ধরে রাখতে হলে নীতিসহায়তা অব্যাহত রাখাটা অপরিহার্য।’

চীনে গত মাসে শিল্পোৎপাদন আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। কিন্তু বৃদ্ধির এ হার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের জরিপে উঠে আসা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রক্ষেপণের চেয়ে কম। এছাড়া সেপ্টেম্বরে শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অক্টোবরে দেশটিতে খুচরা বিক্রি বেড়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের প্রক্ষেপিত ২ দশমিক ৮ শতাংশের তুলনায় এ হার বেশি। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ৩ শতাংশ। এ অনুযায়ী শিল্পোৎপাদন ও খুচরা বিক্রি উভয় খাতেই গত মাসে ২০২৪ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে শ্লথ প্রবৃদ্ধির দেখা পেয়েছে চীন।

এ মুহূর্তে চীনের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণের চেয়ে বহিঃউপাদানগুলো নিয়েই আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন এনবিএসের মুখপাত্র ফু লিংহুই। তিনি বলেন, ‘সামগ্রিক অর্থনীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং নতুন শিল্প গঠনে অগ্রগতিও হচ্ছে। তবে বহির্বিশ্বের পরিবেশে অনেক অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত উপাদান বিদ্যমান। এ মুহূর্তে চীনের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বড় কিছু পরিবর্তন দরকার। কিন্তু তাতেও জটিলতা রয়েছে।’

কোনো কোনো অর্থনীতিবিদের ভাষায় চীন বর্তমান ‘‌টু-স্পিড ইকোনমির’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি এমন এক অবস্থা, যেখানে অর্থনীতির এক অংশ দ্রুত বাড়ছে, অন্য অংশ ধীরগতি বা সংকটের মধ্যে রয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য বিবাদ সত্ত্বেও রফতানি ও বিনিয়োগ কিছুটা হলেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। কিন্তু দুর্বল চাহিদা ও দীর্ঘায়িত মূল্যসংকোচনের কারণে চাপে রয়েছে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি।

চীন কর্তৃপক্ষ বছর দেড়েক আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় মুদ্রানীতি শিথিল, প্রণোদনামূলক বন্ড ইস্যু ও পরিবারভিত্তিক সহায়তামূলক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ এখনো ভোক্তা ব্যয়কে জোরালো করতে পারেনি। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে চলা আবাসন বাজারের মন্দা পরিবারগুলোর ব্যয়সক্ষমতা ও ভোক্তা আস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

শিল্প খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন ও মূল্য হ্রাসের প্রতিযোগিতা কমাতে বেইজিং সরকার সম্প্রতি অ্যান্টি-ইনভলিউশন নীতি চালু করেছে। আইএনজির লিন সংয়ের ভাষ্যমতে, এ নীতি কোম্পানিগুলোর জন্য আরো চাপ তৈরি করছে। ফলে অর্থনীতি আরো মন্থর হয়ে যেতে পারে। গত মাসের দুর্বল ঋণ-সংক্রান্ত তথ্য, বিশেষ করে রেনমিনবিভিত্তিক নতুন ঋণের পতনের মধ্য দিয়েও স্থানীয় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগে অনীহার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কনফারেন্স বোর্ডের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইউহান ঝ্যাং বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানগুলো এখন রিয়েল এস্টেট খাত ও ডেভেলপারদের মনোভাবে দুর্বলতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থির সম্পদে বিনিয়োগের মধ্যে উৎপাদন খাতে সামান্য ও অসম বৃদ্ধি দেখা গেছে। এতে এগিয়ে আছে অটোমোবাইল ও পরিবহন সরঞ্জাম খাত। এ পরিস্থিতিতে অবকাঠামো, উন্নত উৎপাদন ও শিল্প আধুনিকায়নে সরকার বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে পারে।’

আরও